
বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের প্রবাসী ব্যবসায়ী এবং এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ ওবিই আবারও ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে যে নতুন বোর্ড গঠন করেছে, তাতেই ফের চেয়ারম্যান হয়েছেন এই বিতর্কিত ব্যবসায়ী। প্রশ্ন উঠছে- যাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে তাঁকে কেন পুনরায় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে বসানো হলো?
২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক এনআরবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে নতুন বোর্ড নিয়োগ দেয়। ওই বোর্ডে ইকবাল আহমেদকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আতর ব্যবসায়ী মাহতাবুর রহমানের হাতে- যিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। তথ্য বলছে, মাহতাবুর রহমান পরিবারের সদস্যদের পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করে ব্যাংকটিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ে একাধিক বিতর্ক থাকলেও তখন কোনো নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নতুন বোর্ড গঠনের লক্ষ্য ছিল ‘স্বচ্ছতা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা’। তবে ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, এক বিতর্কিত ব্যক্তির নেতৃত্বে সুশাসন কতটা সম্ভব- সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
‘ওবিই’ উপাধি থেকে বিতর্কে: ইকবাল আহমেদ যুক্তরাজ্যভিত্তিক সীমার্ক গ্রুপ অব কোম্পানিজ এবং আইবিসিও ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী। সিলেটের এক প্রবাসী পরিবার থেকে উঠে আসা এই ব্যবসায়ী ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইকবাল ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি’ (বর্তমানে আইবিসিও লিমিটেড)। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকেই আজ তার প্রতিষ্ঠানের পণ্য পৌঁছে গেছে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে।
হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিতে তিনি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রথমসারির আমদানিকারক হিসেবে পরিচিতি পান। ২০০১ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের তরফে বাণিজ্যে অবদানের জন্য তিনি পান ‘অফিসার অব দ্য মোস্ট এক্সেলেন্ট অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ (ওবিই) খেতাব। বাংলাদেশেও একাধিকবার সিআইপি (বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। কিন্তু ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচার, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বহুদিনের।
অর্থপাচারের অভিযোগ: বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা (বিএফআইইউ)-এর একাধিক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সীমার্ক গ্রুপের নামে হিমায়িত সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। যুক্তরাজ্যের রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ, বিলাসবহুল গাড়ি ও প্রপার্টি কেনা, এমনকি রাজনৈতিক অনুদানের অর্থায়ন- সবকিছুই এসেছে সেই পাচারকৃত অর্থ থেকে।
এক সিনিয়র ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, শুধু লন্ডনেই ইকবাল আহমেদের নামে অন্তত ২০টির বেশি বাড়ি রয়েছে। তিনি শেখ হাসিনা পরিবারের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় কোনো তদন্তে অগ্রগতি হয়নি। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠ মহলে ইকবালের ব্যাপক প্রভাব ছিল। একাধিক সূত্র বলছে, শেখ পরিবারের বিনিয়োগও রয়েছে ইকবালের যুক্তরাজ্যভিত্তিক কম্পানিগুলোর মধ্যে- সিমার্ক পিএলসি, আইবিসিও হোল্ডিংস, এমএআই ইনভেস্টমেন্ট, ভার্মিলিয়ন গ্রুপ লিমিটেড ও ফ্লাইং ইউনিকর্ন সহ অন্তত নয়টি প্রতিষ্ঠানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত: বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছে- কেন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে নতুন পর্ষদের শীর্ষে বসানো হলো? ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অর্থপাচার বা দুর্নীতির অভিযোগে যাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে, তাঁকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানানো নৈতিকভাবে ভুল। এটি সংস্কারের চেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক খাতকে সুশাসনের পথে আনতে চায়, তবে এই ধরনের নিয়োগ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হবে।
লিগ্যাল নোটিশ ও অভিযোগের বিস্তার: ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনআরবি ব্যাংক থেকেই ইকবাল আহমেদ ও তাঁর দুই ভাই- কামাল আহমেদ ও বিলাল আহমেদ- এর বিরুদ্ধে চার কোটি ৫১ লাখ টাকার অতিরিক্ত ভাড়া গ্রহণের অভিযোগে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। ব্যারিস্টার হেলাল উদ্দিন, যিনি ওই নোটিশ পাঠান। তিনি বলেন-আমরা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের প্রমাণ পেয়েছি। তিন ভাইকে নোটিশ পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পাইনি। ব্যাংক সূত্রগুলো বলছে, অভিযোগের পরও তাঁদের পুনরায় পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
রাজনৈতিক সংযোগ ও প্রভাবের গল্প: ইকবাল আহমেদের ফেসবুক প্রোফাইল, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, তিনি প্রায়ই শেখ হাসিনার সঙ্গে তোলা ছবি শেয়ার করতেন। বিগত এক দশকে আওয়ামী লীগের দাতাসূচিতে তাঁর নাম ছিল শীর্ষ ২০ জনের মধ্যে। এক প্রবাসী ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন- তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অনানুষ্ঠানিক অর্থদাতা। পার্টির নানা কর্মসূচিতে অর্থ দিতেন, বিনিময়ে সুবিধা নিতেন। তবে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভারতে পলায়নের পর তাঁর সামাজিক মাধ্যম থেকে সেই ছবিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। তিনি শেখ হাসিনার ও তার বোন শেখ রেহানার নাম ভাঙিয়ে ব্যাংকে সবসময় প্রভাব বিস্তার করতেন।
ব্রিটেনে কেলেঙ্কারি ও চেম্বার বহিষ্কার: ২০১৫ সালে ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিবিসিসিআই) অভিযোগ আনে, ইকবাল আহমেদ অনিয়ম করে দুই লাখ পাউন্ড গায়েব করেছেন। ব্রিটিশ আদালতে ওই মামলা প্রমাণিত হলে তাঁকে পাঁচ লাখ পাউন্ড জরিমানা ও চেম্বার থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। পরে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির অর্থদাতা হিসেবে ১২ হাজার পাউন্ড দান করেন, কিন্তু পরে খরচ ফেরতের দাবি তুলে নতুন বিতর্কে জড়ান।
ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ: এনআরবি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন-আমরা ভেবেছিলাম, নতুন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবর্তন আনবে। কিন্তু একই বিতর্কিত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনা হতাশাজনক। গ্রাহক ও আমানতকারীদের মধ্যেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এক গ্রাহক বলেন- যখন দেখি অর্থপাচারের অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার চেয়ারম্যান হচ্ছেন, তখন আমাদের জমা রাখা টাকাটাই অনিরাপদ মনে হয়।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত তিন ভাইয়ের সম্মিলিত শেয়ার ছিল ৭.৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে-ইকবাল আহমেদ ৩.৮০%, কামাল আহমেদ ১.৫১%, বিলাল আহমেদ ২.১৩%। দেশে তাঁদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অন্তত ছয়টি- সিমার্ক (বিডি) লিমিটেড, আইবিসিও লিমিটেড, ম্যানরু ইন্টারন্যাশনাল, আইবিসিও এন্টারপ্রাইজ, আইবিসিও ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ, এবং ম্যানরু শপিং সিটি।
যুক্তরাজ্যে তাঁদের নামে ১০টির বেশি কোম্পানি রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই রিয়েল এস্টেট ও বিনিয়োগ খাতে সক্রিয়।
অর্থপাচারের প্রভাব—আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ: ফিন্যানশিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (FATF)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনও অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে ‘মাঝারি ঝুঁকিতে’ রয়েছে। রিপোর্টে ইকবাল আহমেদের মতো কিছু উচ্চপ্রভাবশালী প্রবাসী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পরামর্শ দেওয়া হয়। এক আর্থিক বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্তদের পুনরায় নিয়োগ না দেওয়া। এতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (আইবিবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক বলেন- যেখানে ব্যাংকিং খাত স্বচ্ছতা ফেরানোর লড়াই করছে, সেখানে বিতর্কিত ব্যক্তিরা নেতৃত্বে এলে পুরো ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও কঠোর বাছাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
নীরব ইকবাল, অস্বস্তিতে এনআরবি: প্রতিবেদনের জন্য একাধিকবার ইকবাল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এনআরবি ব্যাংকের সচিব রেজাউল করিম বলেন, আমাদের জনসংযোগ বিভাগ এই বিষয়ে কথা বলবে। তবে ব্যাংকের জনসংযোগ প্রধান সালাউদ্দিন মুরাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন-পর্ষদ পুনর্গঠনে সব দিক বিবেচনা করা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের আওতায় আসবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যখন দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, তখন ইকবাল আহমেদের পুনরুত্থান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- সংস্কারের মুখোশে কি পুরনো ক্ষমতাবানদের প্রত্যাবর্তন ঘটছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি অর্থপাচার, লিগ্যাল নোটিশ ও আন্তর্জাতিক বিতর্কের মতো গুরুতর অভিযোগের সমাধান না হয়, তাহলে এনআরবি ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই জনগণের আস্থা ফিরে পাবে না। আর গ্রাহকরা আজ সেই প্রশ্নই করছেন যে ব্যাংকে অভিযুক্তরাই চেয়ারম্যান, সেখানে আমাদের টাকার নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?